সুদানের চলমান গণহত্যা: এক "বিস্মৃত" মানবিক বিপর্যয়

২০২৩ সাল থেকে সুদানের সামরিক বাহিনী (এসএএফ) এবং আরএসএফ-এর মধ্যে চলা গৃহযুদ্ধ কীভাবে ভয়াবহ গণহত্যার জন্ম দিয়েছে? দারফুরের এল-ফাশের সহ অন্যান্য অঞ্চলে চলমান নৃশংসতা ও বিশ্বের নীরবতা নিয়ে বিশ্লেষণ।

Nov 1, 2025 - 12:06
Jan 1, 2026 - 03:23
 0  0
সুদানের চলমান গণহত্যা: এক "বিস্মৃত" মানবিক বিপর্যয়

⚠️ সুদানের বর্তমান পরিস্থিতি (নভেম্বর ২০২৫)

১. এল-ফাশেরের পতন ও গণহত্যার তীব্রতা

  • ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ: সুদানের আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (RSF) সম্প্রতি পশ্চিম দারফুর অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ শহর এল-ফাশের (El-Fasher) দখল করেছে (অক্টোবর, ২০২৫)। এটি ছিল দারফুরে সুদানের সামরিক বাহিনীর (SAF) শেষ শক্ত ঘাঁটি।
  • গণহত্যার অভিযোগ: শহরটি দখলের পর মাত্র কয়েক দিনে আরএসএফ-এর হাতে অন্তত দেড় হাজার (১,৫০০) বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্ক এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো এটিকে 'সত্যিকারের গণহত্যা' বা 'জাতিগত নিধন' হিসেবে বর্ণনা করেছে, যেখানে অ-আরব জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
  • হাসপাতালে হামলা: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) নিশ্চিত করেছে যে এল-ফাশেরের প্রধান হাসপাতালে হামলা চালিয়ে অন্তত ৪৬০ জন রোগী ও তাদের স্বজনদের হত্যা করা হয়েছে।

২. মানবিক সংকট ও বাস্তুচ্যুতি

  • বৃহত্তম মানবিক সংকট: জাতিসংঘ (UN) এই সংঘাতকে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট হিসেবে অভিহিত করেছে।
  • বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা: ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। এর মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিবেশী দেশগুলোতে শরণার্থী হয়েছে এবং বিপুল সংখ্যক মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
  • এল-ফাশের থেকে পলায়ন: শুধু এল-ফাশের শহর থেকেই আরএসএফের দখলদারিত্বের পর থেকে ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ পালিয়ে গেছে। পালিয়ে যাওয়া এসব মানুষ ধর্ষণসহ ভয়াবহ নৃশংসতার বিবরণ দিচ্ছে।
  • খাদ্য ও চিকিৎসা সংকট: যুদ্ধের কারণে ত্রাণ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ চরম খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা এবং দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে রয়েছে। পর্যাপ্ত আশ্রয়, খাদ্য ও চিকিৎসার অভাবে শিশুরা মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে।

৩. সংঘাতের নিয়ন্ত্রণ ও ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন

  • আরএসএফ-এর আধিপত্য: এল-ফাশের দখলের পর আরএসএফ এখন সুদানের পশ্চিমাঞ্চল (দারফুর) এবং পার্শ্ববর্তী কর্ডোফান অঞ্চলের একটি বড় অংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
  • সুদানের বিভাজন: এই নিয়ন্ত্রণ লাভের ফলে সুদান ভৌগোলিকভাবে অনেকটা বিভক্ত হওয়ার পথে। বর্তমানে সামরিক বাহিনী (SAF) রাজধানী খার্তুমের কিছু অংশ, মধ্য ও লোহিত সাগর সংলগ্ন পূর্বাঞ্চল (পোর্ট সুদান) থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
  • বহিরাগত হস্তক্ষেপ: এই গৃহযুদ্ধে মিশর (SAF-এর সমর্থক) এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত (আরএসএফ-কে সহায়তার অভিযোগে অভিযুক্ত) সহ বাইরের বিভিন্ন পক্ষের জড়িত থাকার খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা সংঘাতকে আরও দীর্ঘায়িত ও জটিল করে তুলছে।

সংক্ষেপে, সুদানের পরিস্থিতি চরম অস্থিতিশীল, এবং দারফুরে চলমান নৃশংসতা ও মানবিক বিপর্যয় অতীতের গণহত্যার পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহল থেকে তীব্র নিন্দা এলেও, সংঘাত থামানোর কার্যকর পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত নেওয়া হয়নি।

এক নজরে সুদানের ভয়াবহতা

২০২৩ সালের এপ্রিল মাস থেকে আফ্রিকার তৃতীয় বৃহত্তম দেশ সুদান এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের কবলে পড়েছে। ক্ষমতার দখল নিয়ে দেশটির সামরিক বাহিনী (Sudanese Armed Forces - SAF) এবং শক্তিশালী আধা-সামরিক গোষ্ঠী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (Rapid Support Forces - RSF)-এর মধ্যে শুরু হওয়া এই সংঘাত দ্রুতই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বিশেষ করে পশ্চিম দারফুর অঞ্চলে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ও স্থানীয় চিকিৎসকদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সংঘাত এখন গণহত্যার পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে নারী ও শিশুসহ হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত এবং কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

সংঘাতের মূল কারণ ও চরিত্র

১৯৮৯ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারী দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরকে ২০১৯ সালে গণবিক্ষোভের মুখে ক্ষমতাচ্যুত করার পর সুদানে একটি যৌথ সামরিক-বেসামরিক সরকার গঠিত হয়। কিন্তু ২০২১ সালের অক্টোবরে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেই সরকারকে উৎখাত করা হয়। এই অভ্যুত্থানের কেন্দ্রে ছিলেন সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান (SAF) এবং তার ডেপুটি জেনারেল মোহাম্মদ হামদান দাগালো (RSF)।

মূলত আরএসএফ-কে সেনাবাহিনীর সঙ্গে একীভূত করার পরিকল্পনা এবং নতুন যৌথ বাহিনীর নেতৃত্ব নিয়ে দুই জেনারেলের মধ্যে মতবিরোধ শুরু হয়। এই ক্ষমতার দ্বন্দ্বই ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল সশস্ত্র সংঘর্ষের জন্ম দেয়।

দারফুরে গণহত্যার পুনরাবৃত্তি

পশ্চিম দারফুর অঞ্চল, যা বহু বছর ধরে জাতিগত সংঘাতের ক্ষেত্র, সেখানেই সবচেয়ে ভয়াবহ নৃশংসতা সংঘটিত হচ্ছে। আরএসএফ মূলত কুখ্যাত 'জানজাবিদ' মিলিশিয়া থেকে উদ্ভূত, যাদের বিরুদ্ধে ২০০০-এর দশকের প্রথম দিকে দারফুরে গণহত্যা চালানোর অভিযোগ ছিল। এবারও তাদের বিরুদ্ধে মাসালিত এবং অন্যান্য 'আরব নয়' এমন জাতিগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালানোর অভিযোগ উঠেছে।

  • এল-ফাশের (El-Fasher) ট্রাজেডি: দারফুরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ শহর এল-ফাশের, যা সেনাবাহিনীর শেষ ঘাঁটি ছিল, ১৭ মাসের অবরোধের পর সম্প্রতি আরএসএফ দখল করে নেয় (অক্টোবর, ২০২৫)। বিভিন্ন মেডিকেল গ্রুপ ও গবেষকের তথ্যমতে, এই দখলদারিত্বের সময় মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে দেড় হাজারেরও বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। এর মধ্যে হাসপাতালে হামলা এবং পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকারী সাধারণ নাগরিকদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানোর ঘটনাও রয়েছে।

  • বিশাল সংখ্যক হতাহত ও বাস্তুচ্যুতি: জাতিসংঘ এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, চলমান যুদ্ধে এ পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে (জাতিসংঘের হিসেবে প্রায় ৪০ হাজার) এবং প্রায় ১ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে, যা এটিকে পৃথিবীর বৃহত্তম মানবিক সংকটে পরিণত করেছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও "বিস্মৃত যুদ্ধ"

সুদানের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রতিক্রিয়া একেবারেই সীমিত। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একে বিশ্বের 'বিস্মৃত যুদ্ধ' হিসেবে অভিহিত করেছে। বিশ্বের মনোযোগ ইউক্রেন বা গাজার দিকে নিবদ্ধ থাকায় সুদানের এই ভয়াবহতা অনেকটাই আড়ালে থেকে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলের এই নীরবতা আরএসএফ-কে আরও বেপরোয়া করে তুলছে বলে মনে করা হচ্ছে।

মানবিক বিপর্যয় ও ভবিষ্যৎ আশঙ্কা

সংঘাতের কারণে সুদানের ২ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি মানুষ চরম খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। খাবার, ওষুধ ও জরুরি পণ্য প্রবেশে বাধা দেওয়ায় অপুষ্টি, কলেরা, ম্যালেরিয়ার মতো রোগের ঝুঁকি চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এই প্রভাব মারাত্মক। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, চলমান সংঘাত সুদানের ভৌগোলিক বিভাজনের দিকে নিয়ে যেতে পারে, যেমনটি দক্ষিণ সুদানের ক্ষেত্রে ঘটেছিল। দ্রুত যুদ্ধবিরতি এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ না খুললে এই বিপর্যয় আরও গভীর হবে।

ঋবি (রেফারেন্স/ঋণস্বীকার):

এই আর্টিকেলের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে নিম্নলিখিত নির্ভরযোগ্য উৎসসমূহের তথ্যকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে:

  1. জাতিসংঘ (UN/UNOCHA/UNHCR): সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা, মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা এবং নিহতদের পরিসংখ্যান সংক্রান্ত তথ্য।
  2. সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্ক (Sudan Doctors Network): যুদ্ধক্ষেত্রে হতাহত এবং বিশেষ করে এল-ফাশেরের মতো এলাকায় মৃত্যুর সংখ্যা ও স্বাস্থ্যখাতের ওপর হামলার তথ্য।
  3. অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল (Amnesty International) ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (Human Rights Watch): আরএসএফ-এর বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ, জাতিগত নিধনযজ্ঞের প্রতিবেদন এবং সংঘাতের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বিশ্লেষণ।
  4. বিবিসি (BBC) ও রয়টার্স (Reuters): গৃহযুদ্ধের শুরু, দুই প্রধান জেনারেলের দ্বন্দ্ব, এবং এল-ফাশেরের সাম্প্রতিক দখলদারিত্বের ঘটনাপ্রবাহ।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0